May 3, 2026, 2:45 pm

ড. আমানুর আমানের কলাম/
দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবে একের পর এক শিশু মৃত্যুকে প্রথম দিকে বিচ্ছিন্ন ঘটান হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও—এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো স্বাস্থ্যঘটনা নয়, বরং এক ধরনের জাতীয় সংকেত। কারন ইতোমধ্যে সরকারের সময় যথেষ্ট লম্বা হয়েছে। যা মৃত্যুগুলোকে বেঁধে ফেলানোর জন্য কম নয়। এখন আর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কারোর হাতেই নেই। সবথেকে বড় কথা শিশুর জীবন বাঁচানো বড় কথা। কে কি করেছে, কে কি করেনি। সে প্রশ্ন পরেও করা যায়।
হাসপাতালগুলোতে ভিড়, গ্রামে গ্রামে আতঙ্ক, আর শহরের পরিসংখ্যানে মৃত্যুর সংখ্যা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে। কিন্তু এই সংকটের মধ্যেও সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি যেন বারবার হারিয়ে যাচ্ছে: দায় কার?
সরকারি তথ্য বলছে, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অথচ একই সময়ে স্বাস্থ্য প্রশাসন থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক মহল পর্যন্ত প্রায় সবাই একে অপরের দিকে দায় ঠেলে দিচ্ছেন। কোথাও টিকার সংকটের কথা বলা হচ্ছে, কোথাও আবার জনগণের অসচেতনতা, কোথাও মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক ব্যর্থতা। ফলে সমস্যার সমাধানের বদলে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের “দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা”।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছে, হামের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু টিকা কাভারেজ বা সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা নয়, বরং এর পেছনে আরও গভীর কাঠামোগত প্রশ্ন রয়েছে। রোগটির বিস্তার কেন বাড়ছে, কোন বয়সের শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে, কিংবা এটি কোনো নতুন ভ্যারিয়েন্ট কি না—এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। অথচ নীতিনির্ধারণের আগে এই বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণই সবচেয়ে জরুরি ছিল।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। রোগতত্ত্ববিদদের কেউ কেউ সরাসরি গবেষণার ঘাটতির কথা বলছেন, আবার সরকারি পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা বলছেন—এটি মূলত ইপিআই বা টিকাদান কর্মসূচির বিষয়। ফলে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, যার ভেতরে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও ধীর ও জটিল হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে টিকাদান কাভারেজ নিয়েও তৈরি হয়েছে দ্বৈত চিত্র। একদিকে কাগজে-কলমে উচ্চ কাভারেজের দাবি, অন্যদিকে বাস্তব মাঠপর্যায়ের তথ্য ও ইভ্যালুয়েশন সার্ভেতে তুলনামূলকভাবে কম হার। এই ব্যবধানই প্রশ্ন তুলছে—আসলে বাস্তব চিত্র কতটা সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের তথ্যগত অসামঞ্জস্য সংকট মোকাবিলাকে আরও দুর্বল করে দেয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে আক্রান্ত শিশুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ টিকা গ্রহণের বয়সের আগেই সংক্রমিত হচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল টিকা না নেওয়ার নয়, বরং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সামগ্রিক দুর্বলতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। মায়েদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, শিশুদের পুষ্টিহীনতা, এবং হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের ঘাটতি—সব মিলিয়ে একটি জটিল স্বাস্থ্য বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যার গভীরে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি।
এদিকে টিকা সরবরাহ ও ক্যাম্পেইন নিয়েও চলছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। সরকারি পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, টিকা পর্যাপ্ত আছে এবং সরবরাহে কোনো সংকট নেই। এমনকি বড় পরিসরের ক্যাম্পেইনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলন, প্রশাসনিক জটিলতা এবং তথ্য হালনাগাদের ঘাটতির বিষয়গুলোও সামনে আসছে।
ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠছে—যেখানে টিকাও আছে, কাভারেজও আছে, কর্মসূচিও আছে, সেখানে শিশু মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বগতি কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আবারও ফিরে আসে দায়ের রাজনীতি। এক সময় এই ইস্যুতে মূলত রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট ছিল—একপক্ষে সমালোচনার ভাষা, অন্যপক্ষে নীরবতা। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। প্রশাসনিক ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা—সব একসঙ্গে মিশে গিয়ে একটি অস্পষ্ট ও জটিল চিত্র তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সমন্বয়ের অভাব। স্বাস্থ্যনীতি, টিকাদান কর্মসূচি, গবেষণা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা—এই চারটি স্তর যদি একসঙ্গে কাজ না করে, তাহলে কোনো সংকটই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। বর্তমানে সেই সমন্বয়ই প্রশ্নের মুখে।
সবচেয়ে হতাশাজনক দিক হলো, শিশু মৃত্যুর মতো স্পর্শকাতর একটি ইস্যুতে এখনো কার্যকর গবেষণা ও স্বচ্ছ তথ্য উপস্থাপনার ঘাটতি স্পষ্ট। ফলে জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে, আর সেই শূন্যতার ভেতরেই বাড়ছে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ।
সবশেষে একটি প্রশ্নই থেকে যায়—এই মৃত্যু কি কেবল ভাইরাসের, নাকি আমাদের নীতিগত গাফিলতি, তথ্য বিভ্রান্তি এবং দায় এড়ানোর সংস্কৃতিরও ফল? উত্তর খোঁজার বদলে যদি দায় চাপানোর খেলাই চলতে থাকে, তবে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
ড. আমানুর আমান/সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস